অসাম্প্রদায়িক সমাজের সন্ধানে

ছবি সংগীত
১৯৪৭ সালে তড়িঘড়ি করে দেশবিভাগ দুটি পৃথক জাতির উদ্ভব ঘটায়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দার্শনিক ভিত্তি ধর্ম, ভারত দ্বিজাতিতত্ত্বকে বাতিল করে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হিসেবে গ্রহণ করে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে। তবে এ কথাও ঠিক, এ জনপদের নৃতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক বা সামাজিক প্রেক্ষাপটও হয়তো সমাজের অভ্যন্তরে নীরবে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটিয়ে ফেলেছিল।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি সে বিভাজনকে শাসনের সুবিধায় কাজে লাগাবে-এতেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। পাকিস্তান সৃষ্টির ধারণায়ও বেশকিছু দুর্বলতা ছিল, অসংগতিও ছিল। প্রথমত, একটি নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর জন্য ভূখণ্ড পৃথক করা অবাস্তব, পশ্চাৎপদ কল্পনা। ভৌগোলিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য-কোনো মানদণ্ডেই পাকিস্তানের পক্ষে সে ভাবনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল না।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই সে তত্ত্ব থেকে অবশ্য জিন্নাহ সরে আসেন। নিজ নিজ মাতৃভূমিকে মেনে নিতে বলেন। তবে সাতচল্লিশ থেকেই ভারত ও পাকিস্তানের পথচলা আলাদা হয়ে যায়। ভারত গণতন্ত্রের পথে হাঁটে, পাকিস্তান সামরিক একনায়কতন্ত্রে ভর করে অভিজাত বেনিয়া গোষ্ঠীর স্বার্থকে পোক্ত করার সুযোগ করে দেয়। রাষ্ট্রযন্ত্র ধর্মকে শাসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। সাম্প্রদায়িকতাবোধে আচ্ছন্ন এক বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বিভ্রান্তির চোরাগলিতে পথ হারায়।

পাকিস্তান আন্দোলনের ঘোর সমর্থক বাঙালি জাতি কেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল বা কীভাবে বাঙালি মননে পৃথক জাতিসত্তার ভ্রূণসঞ্চার ঘটল, তা ইতিহাস পাঠে বেশ কৌতূহলের বিষয়। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভৌগোলিক ব্যবধান ১২০০ মাইলের বেশি। নৃ-তাত্ত্বিক বা সাংস্কৃতিকভাবে দুই ভূখণ্ডের পার্থক্য যোজন-যোজন। শারীরিক বা মানসিক গঠনেও প্রকৃতিগত দূরত্ব ছিল।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষায়: প্রকৃতি তার নিজের হাতে আমাদের চেহারা ও ভাষায় বাঙালিত্বের যে ছাপ মেরে দিয়েছে, তা মালা-তিলক, টিকি-টুপি, দাড়ি-পৈতাতে ঢাকার আর জো নেই। কিংবদন্তি এ ভাষাবিজ্ঞানীর মতে, আমরা যে হিন্দু বা মুসলমান, তার চেয়ে বড় সত্যি আমরা বাঙালি। হাজার বছরের ইতিহাস পরিক্রমায়ও যে সত্যটি মূর্ত হয়ে ওঠে তা হলো বহিরাগত দখলদার শক্তি শাসনের সুবিধায় বিভক্তি, ঘৃণা ও প্রতিহিংসার বীজ পুঁতে গেলেও বৃহত্তর বাঙালি জনমানসে তার নেতিবাচক অভিঘাত কখনো চওড়া হয়নি।

মার্কিন কূটনীতিক আর্চার কে ব্লাডের মতে, পশ্চিম পাকিস্তানে কট্টর ভারতবিরোধিতা যখন জনপ্রিয় রাজনৈতিক এজেন্ডা, পূর্ব বাংলায় তখন তা আগ্রহের কোনো বিষয় ছিল না। পাকিস্তানিরা সে সময় পুরো কাশ্মীর দখলের জন্য মরিয়া। অথচ সে বিষয় নিয়ে পূর্ব বাংলার মানুষের উদ্বেগ খুব কমই ছিল। বরং কলকাতাই ছিল এ বাংলার প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।

১৯৬১ সালে বাঙালি যখন বিশ্বকবির জন্মশতবার্ষিকী পালনের আবেগে উচ্ছ্বসিত, পাকিস্তান তখন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার পথে পা বাড়িয়েছে। ৫৬ শতাংশ মানুষের ভাষা বাংলাকে পাশ কাটিয়ে মাত্র ৬ শতাংশের ভাষা উর্দুকে জোর করে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। এভাবে সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করেও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। জাতিসত্তার অস্বীকৃতি তদানীন্তন পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার নীতিতে পরিণত হয়। একদিকে তাচ্ছিল্য, অন্যদিকে ক্ষমতার দম্ভ।

১৯৬৩ সালে এক সম্মেলনে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান বাঙালি জাতিকে জন্তুর সঙ্গে তুলনা করেন। বেগম সুফিয়া কামাল এর তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। একইসঙ্গে লাহোর থেকে প্রকাশিত একটি অভিধানে বাঙালি শব্দের অর্থ করা হয় ‘প্রেত’ অর্থাৎ মৃত মানুষের অতৃপ্ত আত্মা। গোটা বাংলা এর প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে। শব্দটি অভিধান থেকে বাদ দেয়া হয় ঠিকই; কিন্তু পাকিস্তানিদের মন থেকে ঘৃণা-বিদ্বেষ উধাও হয়ে যায়নি।

ব্রিগেডিয়ার জিলানি সরাসরি বলে ফেলেন-বাঙালিকে বেশি স্বাধীনতা না দেয়াই ভালো। অনেককাল এরা পরাধীন ছিল। হঠাৎ করে স্বাধীনতা পেলে গোল বাধিয়ে বসবে। তার এ তত্ত্বে সাম্প্রদায়িক রং চড়িয়ে জেনারেল নিয়াজি বলেছিলেন, বাঙালিদের মধ্যে যারা শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক হয়েছেন, তাদের শিক্ষাগুরু সবাই হিন্দু। তাই এই শিক্ষিত শ্রেণিই আমাদের আসল শত্রু।

১৯৭১-এর গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা বা স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যা, জেলহত্যা বা বিভিন্ন পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যাবে না। যে বর্ণনাতীত বর্বরতায় একাত্তরে গণহত্যা হয়েছে, তা শুধু দেশে নয়, বিদেশিদের চোখেও অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। মার্কিন সিনেটর কেনেডির ভাষায়: এমন বর্বরতা কল্পনার সীমাকেও ছাড়িয়ে যায়। ঝাঁক-ঝাঁক বিদেশি গবেষক এ বীভৎস হত্যাকাণ্ডের নারকীয়তা বর্ণনা করতে গিয়ে ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলেন।

ঘটনাগুলোকে মানসচোখে ফিরিয়ে আনলে যে কোনো মানুষ মানসিক সুস্থতা হারাবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। সবাই একমত হয়েছিলেন, এ নারকীয়তা নাৎসি, হালাকু খান বা চেঙ্গিশ খানের হিংস্রতাকেও ম্লান করে দিয়েছিল। নিরীহ, নিরস্ত্র, জীবন্ত মানুষের দেহ থেকে চোখ তুলে ফেলা, হৃৎপিণ্ড-কিডনি উপড়ে ফেলা বা নারীদেহের বিভিন্ন অঙ্গকে জীবন্ত অবস্থায় বিচ্ছিন্ন করা কিংবা জিপের পেছনে বেঁধে টানতে টানতে হাড় থেকে মাংস আলাদা করে ফেলার পাশবিক উল্লাস তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়-দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ঘৃণা, জাতিগত বিদ্বেষের ফল বলে মনে হয়। ধর্মকে নিপীড়কের স্বার্থে ব্যবহারের নজির সম্ভবত প্রাচ্যের দেশগুলোয় পাকিস্তানই তৈরি করেছিল।

রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত একটি আধুনিক রাষ্ট্রে অসহিষ্ণুতা বা মূল্যবোধের সংকট আমাদের চিরচেনা চারপাশকে যেভাবে বদলে ফেলল, সেটা বিস্ময়কর। বিগত দেড়শ বছরে আমাদের সমাজ এমন সংকটে পড়েছিল কি না, বলা যায় না। বাঙালি প্রগতিশীলতার উত্থান ঘটেছে ইংরেজ আমলে, সে কথা হয়তো সবাই স্বীকার করবে। সাম্প্রদায়িকতার চোরা স্রোত সমাজের গভীরে কোথাও সক্রিয় থাকলেও তা শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চা, উদার সুফিবাদ কিংবা অভিন্ন কৃষিভিত্তিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার কারণে মাথাচাড়া দিতে পারেনি।

বিশেষ করে সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনে তার কোনো ছায়া পড়েনি। পাকিস্তান আমলেই আমরা ভাষাভিত্তিক ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক জাগরণ লক্ষ করেছি। শিক্ষা আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, ছয় দফা, এগারো দফা, গণ-অভ্যুত্থান-সর্বত্রই অসাম্প্রদায়িক সমাজের আকাক্সক্ষাই সমষ্টিগত ভাবনায় প্রাধান্য পেয়েছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস আদালত, হাটবাজার-সর্বত্রই বাঙালিয়ানার জয়জয়কার। সাংস্কৃতিক পরিসর ছিল সমৃদ্ধ, রুচিস্নিগ্ধ ও ঐতিহ্যঋদ্ধ। লোকায়ত সংস্কৃতির ছিল নিজস্ব জৌলুস, তেজস্বিতা।

পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই আমাদের শুরু হয় পেছন ফিরে চলা। আইয়ুব খানের পথেই রাজনীতিকে নষ্ট করার চেষ্টা হলো। চরিত্রগতভাবে বদলে যাওয়া অর্থনীতির সুবিধা পেল পরাজিত শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, এমনকি তৎকালীন বিশ্ব পরিমণ্ডলে মুক্তিযুদ্ধের শত্রু-মিত্র সম্পর্কেও নতুন প্রজন্মকে অন্ধকারে রাখা হলো। বিভক্ত শিক্ষাকাঠামোয় সুবিধাভোগী শ্রেণির জন্য অভিজাত ইংরেজি স্কুল, আর গ্রামের প্রান্তিক মানুষের জন্য মানহীন মাদ্রাসার স্বেচ্ছাচারী বিস্তার ঘটতে থাকে।

মধ্যবর্তী শিক্ষাব্যবস্থাও দুর্নীতি, যথেচ্ছাচার ও অব্যবস্থায় জর্জরিত হলো। স্বাভাবিক নিয়মেই মুক্তিযুদ্ধের উচ্চমার্গীয় নীতিবোধও হারিয়ে গেল। দেশপ্রেমবর্জিত এ শূন্যস্থান দখল করল ধর্মীয় উগ্রবাদ, লাগামহীন দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদ। শিক্ষার্থীদের পাঠক্রমকে পরিকল্পিতভাবে বিকৃত করা হলো; যাতে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিভ্রান্তির চোরাবালিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকে।

দীর্ঘ একুশ বছর ক্রমাগত মিথ্যাচার ও ইতিহাস বিকৃতি একটি প্রজন্মকে পথভ্রষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। ১৯৭১ সালেও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জনসংখ্যা সত্যিকার অর্থে খুব একটা কম ছিল না। বিরামহীন অপপ্রচারের মুখে এ সংখ্যা বেড়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষদল এ পরিস্থিতিতে আদর্শিক অবস্থান থেকে কতটা সঠিক দায়িত্ব পালন করেছে, তা ইতিহাস বিচার করবে।

বর্বর পেশিশক্তি কীভাবে ন্যায়কে পর্যুদস্ত করতে উদ্যত হয়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ’৭১। বাছবিচারহীন গণহত্যা, ধর্ষণ, পৈশাচিক নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক হিংসা এবং ছলচাতুরীর আড়ালে নির্মম আঘাতের কৌশল; যার আঁচ আমরা স্বাধীনতা-উত্তরকালেও অনুভব করে চলেছি। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ধর্মীয় নিপীড়নের বিচার হয়নি, দেশত্যাগ করেছে একটা বিপুল অংশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।

অর্পিত সম্পত্তির মীমাংসা আজও অধরা। পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রদায়িকীকরণ ঠেকানো যায়নি। বরং ফেইক নিউজ, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো অব্যাহত রয়েছে। এমন একটা ধারণাকে কৌশলে বৈধতা দেয়া হচ্ছে যে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আপসকামী হতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শতাংশের নিরিখে দেশে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অধিকার জন্মায় না। যদি তাই হতো তাহলে ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, রাশিয়া, এমনকি প্রতিবেশী ভারতেও এ যুক্তি অপ্রাসঙ্গিক হতো না। এমন যুক্তি খুবই পশ্চাৎপদ, অনগ্রসর। আর সাম্প্রদায়িক বিভাজন যে একটা দেশকে উন্নত করে না, তার প্রমাণ পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশে এমন বক্তব্য প্রকাশ্যে তুলে ধরাও আদর্শিক দ্বিচারিতার প্রতিফলন।

মুক্তিযুদ্ধে শুধু বৈষয়িক সম্পদের অপরিমেয় ক্ষতি হয়নি, সবচেয়ে বড় ক্ষতি-বুদ্ধিজীবী হত্যা। মনে রাখতে হবে, সে হত্যাকাণ্ডের প্রলম্বিত অভিঘাত হলো বঙ্গবন্ধু হত্যা; যা পরিকল্পিত ছকে বাস্তবায়ন করে পরাজিত শক্তি। এরপর ক্রমশ সক্রিয় হয়ে ওঠে ধর্ম ব্যবসায়ী, পাক প্রশাসনের উচ্ছিষ্ট সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবী।

অভিভাবকশূন্য প্রেক্ষাপটে একের পর এক ঘটতে থাকে মর্মান্তিক ঘটনা। জেলহত্যা, ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ড, ত্যাগী রাজনীতিক-লেখক-সাংবাদিক-কবি-সাহিত্যিক হত্যার মতো ভয়ানক বর্বরতার সাক্ষী হয় মুক্ত স্বদেশ। দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তির প্রহরে একটা বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সে সময় পাকিস্তান তার অর্ধেক ভূখণ্ড হারিয়ে দিশেহারা। পশ্চিম রণাঙ্গনে দেড় হাজার কিলোমিটারের বেশি জমি ভারতের দখলে। এর সঙ্গে রয়েছে ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দি।

বঙ্গবন্ধুকে ফিরেয়ে আনা ও আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠাই তখন মিসেস গান্ধীর প্রথম এজেন্ডা। তিনি সব রণাঙ্গনে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিচারপতি চৌধুরী ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে লিখেছিলেন: আপনি যদি কোবরার লেজ বিচ্ছিন্ন করে তাকে প্রাণে বাঁচিয়ে রাখেন, তাহলে দশ গুণ বেশি শক্তি নিয়ে এ বিষধর সাপ আপনাকে দংশন করবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-প্রজ্ঞাবান এ মনীষীর সাবধান বাণীটিই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধই চূড়ান্তভাবে দ্বিজাতিতত্ত্বের অসারতা প্রমাণ করেছে। সংস্কৃতি ও ইতিহাসই জাতিসত্তার মূলভিত্তি। স্বাধীনতার মূলমন্ত্রই ছিল সবার আর্থসামাজিক মুক্তি, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক স্বাধীনতা। বাঙালি হবে একটা অসাম্প্রদায়িক জাতি, ধর্মনিরপেক্ষতা হবে রাষ্ট্রের দর্শন। গণতন্ত্র এই সামাজিক ন্যায়কে পরিচর্যা করবে। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, যুক্তিবাদী মননের বিকাশ শিক্ষাব্যবস্থাকে নিশ্চিত করতে হবে। শহিদ বুদ্ধিজীবীদের জীবনী, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী সৃষ্টিকে পাঠ্যপুস্তকে আলোকিত করা প্রয়োজন।

সেই ইতিহাসের খুব প্রয়োজন নেই, যার সঙ্গে যাপিত জীবনের যোগ নেই। সমকালীন শিক্ষার একটা জনপ্রিয় ঝোঁক হলো দক্ষতা অর্জন। অবশ্যই দক্ষতা চাই প্রযুক্তিতে, ভাষায়, বিজ্ঞানে। তবে আরও দরকার যুক্তির সঙ্গে নীতির মেলবন্ধন, আদর্শের সখ্য। দেশের সাংস্কৃতিক শিকড়কে আগলে রাখতেই হবে। বাঙালির আত্মপরিচয়ের ঠিকানা সেখানেই নিহিত। মতাদর্শিক শ্রেষ্ঠত্ব নয়, অন্যকে সহ্য করার স্নিগ্ধ শৈলীরও বিকাশ চাই। শুধু বস্তুগত দক্ষতা নয়, মানবিক ও চেতনাগত উত্তরণও জরুরি; যা মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষায় একটি বহুত্ববাদী, ন্যায়ানুগ সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে-নতুন বছরে এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

অমিত রায় চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *